Back to Library
Reset - Read Free Science Fiction and Thriller Book Cover
0

Reset

By Nasif Muhammad

প্রতিদিন সকালে যদি আপনার পুরো জীবনটা বদলে যায়, তবে আপনি কে? নোভা ইসলাম এক সকালে ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করে তার চেনা মিরপুরের পুরোনো ফ্ল্যাটটি নেই, সে এখন ধানমন্ডিতে থাকে এবং রাহাত নামের এক অচেনা মানুষের সাথে তার বিবাহিত জীবন। অথচ গত রাত পর্যন্তও সে নিশ্চিত ছিল যে সে অবিবাহিত! সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটি ঘটে পরের দিন সকালে। বাস্তবতা আবারও বদলে যায়। প্রতিদিন নতুন বাড়ি, নতুন সম্পর্ক, নতুন স্মৃতি। নিজের পরিচিতি ধরে রাখতে নোভা শুরু করে এক মরিয়া লড়াই। সে কি ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে? নাকি তাকে ঘিরে চলছে অদৃশ্য কোনো মহলের ভয়ংকর কোনো মনস্তাত্ত্বিক খেলা? স্মৃতি, আত্মপরিচয় এবং অস্তিত্বের গোলকধাঁধায় আটকে পড়া এক নারীর শ্বাসরুদ্ধকর সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। শেষ পাতা পর্যন্ত ধরে রাখার মতো সাসপেন্স, যেখানে প্রতিটি সকাল নিয়ে আসে সম্পূর্ণ নতুন এক দুঃস্বপ্ন। নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে নোভা কি পারবে এই ধোঁয়াশার জাল ছিন্ন করতে?

ResetরিসেটNasif Muhammadনাসিফ মুহাম্মাদBangla Science Fiction

Chapters

18

#পর্বঃ ১

চোখ খুলতেই প্রথম যে জিনিসটা নোভা দেখল, সেটা ছিল সিলিং। সাদা। একদম সাদা। কিন্তু কাল পর্যন্ত তার সিলিংয়ে একটা বাদামি দাগ ছিল। পানি পড়ে তৈরি হওয়া দাগ, যেটা অনেকটা বাংলাদেশের মানচিত্রের মতো দেখতে। সেই দাগটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কতদিন ঘুম এসেছে তার। দাগটা নেই।

নোভা উঠে বসল। মাথা ঘুরছে। গলা শুকনো। বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত চাপ, যেন কেউ হৃৎপিণ্ডটা মুঠোয় ধরে একটু একটু করে চেপে ধরছে। সে হাত দিয়ে চোখ কচলাল। আবার তাকাল। না। দাগ নেই।

"ঠিক আছে," সে বিড়বিড় করল, "হয়তো... হয়তো রং করা হয়েছে।" কিন্তু কখন? রাতে? কে করল?

সে বিছানা থেকে নামল। পা দুটো মেঝে ছুঁতেই থামল। মেঝে। কাল পর্যন্ত তার ঘরে কাঠের পুরনো ফ্লোর ছিল। পায়ের নিচে এখন ঠান্ডা, মসৃণ মার্বেল। নোভা দাঁড়িয়ে রইল পুরো এক মিনিট। নিঃশব্দে। শুধু তার শ্বাসের শব্দ। তারপর আস্তে আস্তে ঘর দেখল। বিছানার ডানদিকে একটা নতুন ড্রেসিং টেবিল। বামদিকে একটা বুকশেলফ, তাতে বই সাজানো, কিন্তু বইগুলোর নাম নোভা চেনে না। জানালার পর্দা সাদা ছিল, এখন গাঢ় নীল। দেয়ালে একটা পেইন্টিং ঝুলছে, তাতে একটা নদী আর একটা ভাঙা সেতু। সেই পেইন্টিং নোভা কখনো কিনেছে বলে মনে পড়ে না।

"কী হচ্ছে?" সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল। কোনো উত্তর আসে না।

সে বাথরুমে ঢুকল। আয়নায় নিজেকে দেখল। চেহারা একই। চোখের নিচে কালো দাগ। চুলগুলো এলোমেলো। ঠোঁট শুকনো। কিন্তু বাথরুমের তাকে তার পরিচিত টুথপেস্টের বদলে অন্য ব্র্যান্ড। তার শ্যাম্পুর বোতলের রং আলাদা। নোভা আয়নায় নিজের চোখে তাকাল। দীর্ঘক্ষণ।

"আমি কি স্বপ্ন দেখছি?" সে গালে চিমটি কাটল। ব্যথা পেল। স্বপ্ন না।

সে বাথরুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়ার খুলল। তার পরিচিত জামাকাপড়। ঠিক আছে, অন্তত এটা। সে কাপড় বদলাল। রান্নাঘরে গেল। রান্নাঘরে ঢুকে দেখল একজন মানুষ চা বানাচ্ছে। সে থামল। লোকটা পেছন ফিরে তাকাল। হাসল।

"উঠে গেছ? চা খাবে?"

নোভা তাকে চেনে। চেনার কথাও। কারণ এই মানুষটা তার স্বামী। রাহাত। কিন্তু কাল পর্যন্ত নোভা জানত সে বিবাহিত না। সে একা থাকে। ঢাকার মিরপুরে একটা ছোট ফ্ল্যাটে। এখন এই ফ্ল্যাটটা মিরপুরের না। এটা ধানমন্ডির। আর সে বিবাহিত।

নোভার মাথায় একটা ভোঁ ভোঁ শব্দ শুরু হলো।

"কী হলো?" রাহাত জিজ্ঞেস করল, "মুখ এরকম করে আছ কেন?"

"কিছু না," নোভা বলল। কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। "মাথা একটু ব্যথা।"

"রাতে ভালো ঘুম হয়নি? তুমি কাল রাতে অনেকক্ষণ জেগে ছিলে।"

"হ্যাঁ।" নোভা বসে পড়ল। "হ্যাঁ, ঘুম হয়নি।"

সে চায়ের কাপ হাতে নিল। হাত কাঁপছে। সে খেয়াল করল কাপটা একটু বেশিই শক্ত করে ধরছে। মাথার ভেতরে প্রশ্নগুলো ঘুরছে। রাহাত কে? এই ফ্ল্যাট কোথায়? কাল আমি কোথায় ছিলাম? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আমি কি আসলেই নোভা? নোভা ইসলাম। বয়স সাতাশ। পেশায় ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনার। এটুকু সে নিশ্চিত। কিন্তু বাকি সব?

অফিসে বের হওয়ার আগে সে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। ফোন বের করে নিজের ফেসবুক প্রোফাইল খুলল। প্রোফাইল পিকচার সে নিজেই। কিন্তু পাশে রাহাতের ছবি। ইনফোতে লেখা "Married"। সে ইনস্টাগ্রাম খুলল। সেখানেও রাহাতের সাথে ছবি। একটা ছবিতে তারা দুজন কক্সবাজারে। আরেকটায় হানিমুন ট্রিপ। মালদ্বীপ। নোভা স্ক্রল করে যাচ্ছে। শত শত স্মৃতি, যার একটাও তার মনে নেই। তার কাছে এই সব ছবিগুলো অপরিচিত মানুষের জীবনের অ্যালবামের মতো লাগছে। কিন্তু মেয়েটা সে নিজেই। একটা ছবিতে সে হাসছে। চোখে পানি। পেছনে একটা ফুলের বাগান। ক্যাপশনে লেখা: "সবচেয়ে সুখের দিন।" নোভার বুকটা চুপসে গেল। এই সুখের স্মৃতি তার নেই।

সে ফোনটা রাখল। বাথরুমের আয়নায় আবার নিজেকে দেখল।

"তুমি কে?" সে ফিসফিস করল। আয়নার মেয়েটা কিছু বলল না।

সেদিন সারারাত নোভা ঘুমাতে পারল না। রাহাত ঘুমাচ্ছে পাশে। শান্তির ঘুম। নাক থেকে একটু হালকা শব্দ আসছে। এই মানুষটাকে নোভা চেনে না। কিন্তু সে মানুষটার পাশে শুয়ে আছে। তার সাথে সংসার করছে। হয়তো বছরের পর বছর ধরে। নোভা ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছে। কাল সকালে উঠলে আবার কি সব বদলে যাবে?

#পর্বঃ ২

হ্যাঁ। বদলে গেল। পরদিন সকালে নোভার চোখ খুলল পুরনো মিরপুরের ফ্ল্যাটে। কাঠের ফ্লোর। বাদামি দাগঅলা সিলিং। সাদা পর্দা। রাহাত নেই। সে একা।

নোভা উঠে বসল। শ্বাস নিল। লম্বা, গভীর শ্বাস। ঠিক আছে। আগের জায়গায় ফিরে এসেছে। সব ঠিক আছে। কিন্তু সত্যিই কি ঠিক আছে? সে ফোন তুলল। ফেসবুক খুলল। বায়োতে লেখা "Single"। রাহাতের সাথে কোনো ছবি নেই। মালদ্বীপের ছবি নেই। কক্সবাজারের ছবি নেই। নোভা ফোনটা নামিয়ে রাখল। হাতের তালুতে মুখ রাখল। কাল কি স্বপ্ন ছিল? না। ছিল না। সে নিশ্চিত। স্বপ্নে এত ডিটেইল থাকে না। রাহাতের চায়ের গন্ধ ছিল। মার্বেল মেঝের ঠান্ডা ছিল। সব ছিল। তাহলে?

সে উঠে ডায়েরি খুঁজল। কাল রাতে কিছু লিখেছিল কি? না। লেখেনি। লেখা উচিত ছিল। সে একটা নোটবুক বের করল। কলম নিল। লিখল:

"তারিখ: ৫ মার্চ, ২০২৬। আজ সকালে উঠে দেখলাম সব স্বাভাবিক। কিন্তু গতকাল… গতকাল সব অন্যরকম ছিল। আমি ধানমন্ডিতে ছিলাম। রাহাত নামের একজন স্বামী ছিল। সব কিছু বদলে গিয়েছিল। আজ আবার আগের মতো। এটা কী? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?"

সে কলম রাখল। আবার নিল। "না। আমি পাগল না। আমি নিশ্চিত যা দেখেছি সেটা সত্যি ছিল।"

তৃতীয় দিন।

এবারে ভোরবেলা উঠেই নোভা আগে ডায়েরিটা খুঁজল। নেই। ড্রয়ারে নেই, বিছানার নিচে নেই, টেবিলে নেই। নোটবুকটা উধাও। সে ঘর উল্টেপাল্টে খুঁজল। পেল না। তারপর চারপাশে তাকাল। এই ঘরটা মিরপুরের না। ছোট। অন্ধকার। দেয়াল ধূসর। একটাই জানালা, সেখান দিয়ে বাইরে একটা নির্মাণকাজ চলছে। ক্রেনের শব্দ আসছে।

নোভা কোথায়? সে উঠে দরজা খুলল। একটা করিডোর। অনেকগুলো দরজা। অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। সে নিজের দরজায় নম্বর দেখল। ৭সি। এই অ্যাপার্টমেন্ট কোথায়? কোন এলাকা? সে নিচে নামল। গেটে একজন দারোয়ান। বৃদ্ধ লোক।

"ভাই, এখানে কোন এলাকা?"

দারোয়ান তার দিকে অবাক হয়ে তাকাল। "কী বলছেন আপনি? বসুন্ধরা।"

বসুন্ধরা। নোভা কখনো বসুন্ধরায় থাকেনি।

সে রাস্তায় বেরিয়ে এল। গুগল ম্যাপ খুলল। লোকেশন দেখল। সত্যিই বসুন্ধরা। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পেটের ভেতরে ভয়টা এতক্ষণ থাকলেও এখন একটু একটু করে রাগে পরিণত হচ্ছে। কী হচ্ছে? কে করছে এটা? কেন?

চতুর্থ দিন।

এবার নোভা প্রস্তুত ছিল। ঘুমানোর আগে সে পুরো শরীরে বিভিন্ন জায়গায় নোট রেখেছিল। পকেটে। মোজার ভেতরে। নাইটির পকেটে। ছোট ছোট কাগজের টুকরো। তাতে লেখা: "তুমি নোভা। কাল যা দেখবে তা বাস্তব না।" সকালে উঠে সে প্রথমেই পকেটে হাত দিল। কাগজ নেই। মোজার ভেতরে? নেই। সে একটু ঘাবড়ে গেল। কিন্তু তারপর নাইটির পকেটে হাত দিল। একটা কাগজ। কিন্তু এই কাগজে তার লেখা নেই। অন্য হাতের লেখা। ছোট, সুক্ষ্ম অক্ষরে লেখা মাত্র একটা লাইন: "তুমি যতটা ভাবো, ততটা নিরাপদ না।" নোভার হাত কাঁপল। কেউ জানে সে কী করছে। কেউ তাকে দেখছে।

পঞ্চম দিন।

নোভা ঠিক করল সে এবার রেকর্ড রাখবে। ফোনে। ভিডিও লগ। রাত বারোটায় সে ফোন তুলল। ভিডিও অন করল। "আজকের তারিখ নয় মার্চ। আমি নোভা ইসলাম। বয়স সাতাশ। এই মুহূর্তে আমি মিরপুরের আমার নিজের ফ্ল্যাটে আছি। কাল সকালে উঠে যা দেখব, তার সাথে আজকের তুলনা করব।" সে ঘরের চারপাশ ধরল। দেয়াল। মেঝে। সিলিং। বাদামি দাগ। "এই দাগটা আছে। এটা থাকার কথা।" সে ভিডিও সেভ করল। ক্লাউডে আপলোড দিল। তারপর ঘুমাল।

সকালে উঠে ফোন তুলল। ভিডিওটা নেই। শুধু ভিডিওটা না, ক্লাউডে যা আপলোড করেছিল, সব গেছে। ফোনের গ্যালারিতে কাল রাতের কোনো ভিডিও নেই। নোভা দাঁত চেপে ধরল। ঠিক আছে। তারা স্মার্ট। কিন্তু আমিও এত সহজে হারব না।

#পর্বঃ ৩

ষষ্ঠ দিন থেকে নোভা পদ্ধতি বদলাল। ডিজিটাল না। অ্যানালগ। সে একটা পুরনো ডায়েরি কিনল। বাজার থেকে। নগদ টাকায়। কোনো অ্যাপ, কোনো ক্লাউড, কোনো ডিজিটাল ট্রেস না। সে ডায়েরিটা নিজের জামার ভেতরে ইলাস্টিকে গুঁজে রাখল। শরীরের সাথে লাগানো। রাতে ঘুমানোর আগে লিখল। সব। তারিখ, সময়, ঘরের বিবরণ, আশেপাশের মানুষের বিবরণ।

সকালে উঠে ডায়েরিটা পাওয়া গেল। পাওয়া গেল! নোভার বুকে একটা উত্তাপ অনুভব হলো। সে খুলল। লেখা ঠিক আছে। কিন্তু একটা পাতায় কেউ লাল কালি দিয়ে একটা বৃত্ত এঁকেছে। সেই বৃত্তের ভেতরে একটা লাইন: "তুমি যা খুঁজছ, সেটা খুঁজে পাবে না।" নোভা ডায়েরিটা বন্ধ করল। কেঁপে উঠল। শুধু শরীর না। আত্মা পর্যন্ত। কেউ তার ঘরে ঢুকেছে। রাতে। তার ঘুমের মধ্যে।

সে ডায়েরির পাতা উল্টাল। আরেকটা পাতায় আরেকটা লেখা পেল, কিন্তু এটা তার নিজের হাতের। কিন্তু সে এটা লেখেনি। লেখায় অনেক গল্প। তার ছেলেবেলার গল্প। মায়ের কথা। বাবার কথা। প্রথম প্রেমের কথা। কিন্তু এই ঘটনাগুলো তার মনে নেই। নোভা পাতা উল্টাতে থাকল। পুরো ডায়েরি ভরা তার জীবনের গল্প। কিন্তু এই জীবন তার না।

সপ্তম দিন।

নোভা সিদ্ধান্ত নিল সে এবার অন্যভাবে প্রমাণ রাখবে। শরীরে। সে একটা সূক্ষ্ম সুই আর কালি দিয়ে নিজের বাম কব্জির ভেতরে একটা ছোট্ট চিহ্ন আঁকল। একটা বিন্দু। একদম ছোট। এটা কেউ মুছতে পারবে না। সকালে উঠে সে কব্জি দেখল। বিন্দুটা আছে। নোভা কাঁদল। আনন্দে না। ভয়ে। কারণ বিন্দুটা আছে মানে সে নিজে আছে। কিন্তু তার চারপাশে সব বদলে যায়। সমস্যাটা তার ভেতরে না। সমস্যাটা বাইরে। কেউ তার চারপাশটাকে বদলে দিচ্ছে। বারবার। প্রতিরাতে। এবং সে জানে না কেন।

অষ্টম দিন।

এই দিনটা একটু আলাদা। নোভা উঠল একটা হোটেল রুমে। একটা বড়, ব্যয়বহুল হোটেল। বিছানার চাদর সাদা। বাইরে থেকে কার্ড দিয়ে দরজা খোলার ব্যবস্থা। সে দরজার কার্ড খুঁজল। পেল। কার্ডে লেখা: "প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও।" সে উঠে জানালার দিকে গেল। বাইরে ঢাকা শহর। কিন্তু ঢাকা শহরটাকে অন্যরকম লাগছে। কেমন শান্ত। কেমন পরিষ্কার। যেন কোনো ফিল্টারে দেখা।

টেবিলে একটা খাম। নোভা খুলল। ভেতরে একটা চিঠি।

"প্রিয় নোভা,

তুমি প্রশ্ন করতে শুরু করেছ। এটা ভালো। এটা মানে তুমি যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে বেশি সচেতন। কিন্তু এখনো অনেক কিছু জানার বাকি। আপাতত একটা কথাই মনে রেখো: তোমার স্মৃতি তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু।

ভালো থেকো।"

চিঠিতে কোনো সই নেই। নোভা চিঠিটা চেপে ধরল। চোখ বন্ধ করল। মাথার ভেতরে একটাই কথা ঘুরছে। কে এটা লিখেছে?

#পর্বঃ ৪

নোভার জীবনে তিনজন স্থায়ী মানুষ। প্রথমজন: তার ছোটবেলার বন্ধু লিলি। এখন সে একটা মার্কেটিং ফার্মে কাজ করে। দ্বিতীয়জন: তার সহকর্মী আরিবা। ফ্রিল্যান্স ডিজাইনার, নোভার মতোই। তৃতীয়জন: তার মা। বরিশালে থাকেন। সপ্তাহে একবার ফোন করেন। কিন্তু এই তিনজনের সাথেও প্রতিদিন কিছু না কিছু বদলে যায়।

নবম দিন।

নোভা লিলিকে ফোন করল।

"লিলি, তুই কি কাল আমাকে ফোন করেছিলি?"

"না তো। কেন?"

"মানে... কিছু না। তুই ভালো আছিস?"

"হ্যাঁ। কিন্তু নোভা, তুই কি ঠিক আছিস? তোর গলা অন্যরকম শোনাচ্ছে।"

"আমি ঠিক আছি।"

"নিশ্চিত? আমি কিন্তু জানি তুই কখন ঠিক থাকিস না।"

নোভা একটু থামল। "লিলি, তুই কি মনে করিস আমি কখনো মানসিক সমস্যায় ভুগেছি?"

ওপাশ থেকে একটু চুপ। "তুই কি আবার সেই স্বপ্নের কথা বলছিস? ডাক্তার বলেছিল..."

"কোন ডাক্তার?" নোভা চেঁচিয়ে উঠল। "আমি কখনো মানসিক ডাক্তারের কাছে যাইনি।"

"নোভা..." লিলির গলা নরম হলো। "তুই কি আবার ওষুধ বন্ধ করে দিয়েছিস?"

"কীসের ওষুধ?"

নীরবতা। তারপর লিলি বলল, "তুই হাসপাতালের ডাক্তারকে ফোন কর। এখনই।"

"কোন হাসপাতাল?"

"ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ। ডাক্তার রায়হান সাহেব।"

নোভার বুকের ভেতরে কিছু একটা শক্ত হয়ে গেল। "লিলি, আমি কখনো মানসিক রোগী ছিলাম না।"

"নোভা, প্লিজ..."

নোভা ফোন রেখে দিল। হাত কাঁপছে।

পরের দিন নোভা আরিবার সাথে কফি শপে দেখা করল। আরিবা এল। বসল। কফি অর্ডার করল। তারপর বলল, "তুমি কি জানো যে তোমার একটা ফাইল আছে?"

"কীসের ফাইল?"

"NIMH-তে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ। তোমার নামে তিন বছর ধরে চিকিৎসার রেকর্ড আছে।"

নোভা স্থির হয়ে বসে রইল। "তুমি কীভাবে জানো?"

আরিবা একটু মুচকি হাসল। কিন্তু হাসিটা স্বাভাবিক না। অদ্ভুত। "আমি জানি কারণ আমি তোমাকে একদিন সেখানে পৌঁছে দিয়েছিলাম।"

"কী?"

"দুই বছর আগে। তুমি তখন প্রচণ্ড খারাপ ছিলে। তোমার মা আমাকে ফোন করেছিল।"

নোভা উঠে দাঁড়াল। "তুমি মিথ্যা বলছ।"

"নোভা, বোসো।"

"না।" সে ব্যাগ তুলল। "তুমি মিথ্যা বলছ এবং আমি জানতে চাই কেন।"

সে কফি শপ থেকে বেরিয়ে গেল। পেছন থেকে আরিবা ডাকছে। সে ঘুরে তাকাল না। বাইরে রোদ। রিকশার শব্দ। মানুষের কোলাহল। নোভার মনে হলো পৃথিবীর সবাই মিলে তাকে পাগল বানাতে চাইছে। কিন্তু কেন?

#পর্বঃ ৫

দশম দিনের সকালে।

নোভা একটা কাগজে একটা ছক আঁকল। বাম দিকে: "যা বদলায়।" ডান দিকে: "যা বদলায় না।"

বাম দিকের লিস্ট দীর্ঘ হলো। ঘর। এলাকা। বৈবাহিক অবস্থা। কাজের জায়গা। বন্ধুদের আচরণ।

ডান দিকের লিস্ট? সে ভাবল। তার নাম বদলায় না। নোভা ইসলাম। সব জায়গায় এই নাম। তার বয়স বদলায় না। সাতাশ। তার পেশা বদলায় না। গ্রাফিক ডিজাইনার। এবং... সে থামল। একটা জায়গা।

প্রতিদিন সকালে জেগে যেখানেই থাকুক না কেন, সে একটা কাজ করে। চা বানায়। এবং চা বানানোর সময় বাইরের জানালায় তাকায়। প্রতিটা ভিন্ন ঘরে ভিন্ন জানালা। কিন্তু জানালার বাইরে দূরে একটা গাছ। একটাই গাছ। প্রতিদিন সেই গাছটা আছে। নোভা চোখ বড় করল। গাছটা প্রতিদিন একই জায়গায়। কিন্তু ঘর বদলায়। মানে ঘর থেকে সেই গাছটার দিক একই থাকে। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? ঢাকার মিরপুর থেকে বসুন্ধরা থেকে ধানমন্ডি থেকে সোনারগাঁও হোটেল… সব জায়গায় জানালার বাইরে একই গাছ? না। এটা সম্ভব না। হয় সে প্রতিদিন একই জায়গায় থাকে। কিন্তু ঘরটাকে বদলে দেখানো হয়। অথবা গাছটা স্থির না। গাছটাও একটা সিম্বল।

নোভা উঠে জানালার কাছে গেল। গাছটা আছে। কড়ই গাছ। বড়, ডালপালা ছড়ানো। সে গাছটার দিকে তাকিয়ে রইল। এই গাছটাই তার একমাত্র স্থির সত্য। সে ঠিক করল এই গাছের কাছে যাবে।

সে বের হলো। জানালা থেকে গাছের দিক বুঝে হাঁটতে শুরু করল। পাঁচ মিনিট। দশ মিনিট। গাছটা পেল। বনানীর একটা পার্কের ভেতরে। বড় কড়ই গাছ। গাছের গোড়ায় একটা পাথর। পাথরের নিচে একটা ছোট প্লাস্টিকের কৌটো। নোভা পাথর সরিয়ে কৌটো তুলল। খুলল। ভেতরে একটা মেমোরি কার্ড।

সে ছুটে ফিরে এল। ল্যাপটপে কার্ড ঢোকাল। একটাই ফাইল। ভিডিও। চাপল। ভিডিওতে একটা মেয়েকে দেখা গেল। সে নিজেই। নোভা নিজেই। কিন্তু চেহারায় ক্লান্তি। চোখের নিচে কালো দাগ আরো গাঢ়। কণ্ঠস্বর কাঁপা।

ভিডিওর নোভা বলছে: "যদি তুমি এটা দেখে থাকো, তার মানে তুমি পথ খুঁজে পেয়েছ। ভালো। কিন্তু শোনো।" সে একটু থামল। "এরপর যা করবে তা করো খুব সাবধানে। কারণ তারা সবখানে আছে। তোমার বন্ধু, তোমার পরিচিত, তোমার চারপাশের মানুষ… সবাই তাদের চোখ। তারা দেখছে তুমি কতটুকু বুঝতে পারো। তুমি জানতে চাইছ কারা তারা? একটা জায়গার নাম মনে রাখো: আর্কাস নিউরো ল্যাব। ঢাকার উত্তরায়। রোড ১৩, বাড়ি ৪৭। এবং একটা কথা। তারা তোমাকে বলবে তুমি পাগল। বলবে তুমি মানসিক রোগী। বিশ্বাস করো না। তুমি পাগল না। তুমি একটা পরীক্ষার বিষয়।"

ভিডিও শেষ।

নোভার পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর একটাই শব্দ বলল। "আর্কাস।"

#পর্বঃ ৬

আর্কাস নিউরো ল্যাব। নোভা গুগল করল। কিছু নেই। ফেসবুকে খুঁজল। কিছু নেই। LinkedIn-এ। কিছু নেই। একটা কোম্পানি যার অস্তিত্ব ইন্টারনেটে নেই। কিন্তু ভিডিওর নোভা নিজেই সে। নিজেই এই ঠিকানা দিয়েছে।

নোভা উঠল। জামা পরল। বের হলো। উত্তরা। রোড ১৩। বাড়ি ৪৭। একটা সাধারণ বাণিজ্যিক বিল্ডিং। পাঁচতলা। গেটে কোনো সাইনবোর্ড নেই। নোভা বিল্ডিংয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে ঢুকবে কি? গেটে একজন সিকিউরিটি গার্ড। ইউনিফর্ম পরা। মুখ শক্ত। নোভা এগিয়ে গেল।

"এখানে আর্কাস নিউরো ল্যাব আছে?"

গার্ড তার দিকে তাকাল। একটু বেশিই দেখল। "এখানে কোনো নিউরো ল্যাব নেই।"

"কিন্তু..."

"এখানে একটা আইটি কোম্পানি আছে। ডিজিটাল সলিউশন।"

"কোন তলায়?"

"সব তলায়।"

নোভা পেছনে সরল। সে বিল্ডিংয়ের উল্টো ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকাল। সব তলায় অফিস। মানুষ দেখা যাচ্ছে। কম্পিউটারে কাজ করছে। কিন্তু একটা তলায় কোনো আলো নেই। তৃতীয় তলা। একটা জানালাও নেই সেখানে। শুধু দেয়াল।

নোভা বিল্ডিংয়ের পাশের গলিতে ঢুকল। পেছন দিক থেকে কোনো প্রবেশপথ আছে কিনা দেখল। একটা ছোট দরজা। তালা লাগানো। কিন্তু দরজার পাশে একটা ক্যামেরা। ক্যামেরাটা সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে তাড়াতাড়ি সরে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগে দেখল ক্যামেরার লাল আলোটা জ্বলছে। মানে ক্যামেরা চলছে। মানে কেউ তাকে দেখছে।

নোভা দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। পেছনে পায়ের আওয়াজ শুনল। ফিরে তাকাল না। হাঁটা বাড়িয়ে দিল। মোড়ের মাথায় একটা রিকশা পেল। উঠে পড়ল। "যান। যেকোনো দিকে। জলদি।" রিকশাওয়ালা অবাক হয়ে প্যাডেল মারতে শুরু করল। নোভা পেছনে তাকাল। একজন লোক গলির মুখে দাঁড়িয়ে তার রিকশার দিকে তাকিয়ে আছে। ফোন কানে। কথা বলছে।

#পর্বঃ ৭

বাড়িতে ফিরে নোভা প্রথম কাজ করল তার নিজের পরিচয় যাচাই। জন্মনিবন্ধন। সে বের করল।

জন্মতারিখ: ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯।

বাবার নাম: করিম ইসলাম।

মায়ের নাম: রেহানা বেগম।

ঠিকানা: বরিশাল সদর।

এটুকু সে জানত।

কিন্তু এরপর সে এনআইডি কার্ড বের করল। এনআইডিতে ছবি আছে। তার। কিন্তু ঠিকানায় লেখা: "ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ওয়ার্ড ৭।" নোভার কপালে ভাঁজ পড়ল। হাসপাতাল কেন ঠিকানা?

সে এনআইডি নম্বর দিয়ে অনলাইনে সার্চ করল। ইলেকশন কমিশনের ওয়েবসাইটে তার নাম পেল। কিন্তু পেশায় লেখা: "Clinical Trial Participant।" ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। মানে পরীক্ষার বিষয়। ভিডিওর নোভা যা বলেছিল। "তুমি একটা পরীক্ষার বিষয়।"

নোভা ল্যাপটপ বন্ধ করল। মাথা টেবিলে রাখল। শ্বাস নিচ্ছে। ছাড়ছে। মনে করার চেষ্টা করছে। তার প্রথম স্মৃতি কী? সে ভাবল। ছোটবেলার কথা মনে করতে গেলে সব কেমন ঝাপসা। যেন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে দেখছে। স্পষ্ট স্মৃতি শুরু হয় মাত্র চার বছর আগ থেকে। চার বছর। এর আগের কিছু নেই। একদম ধোঁয়াটে। নোভা মাথা তুলল। চার বছর আগে কি হয়েছিল?

সে মাকে ফোন করল।

"মা।"

"হ্যাঁ মা। কী হয়েছে? গলা এরকম কেন?"

"মা, আমি তোমাকে একটা সত্যি কথা জিজ্ঞেস করব। তুমি সত্যি উত্তর দেবে?"

"কী হয়েছে বলো তো?"

"চার বছর আগে আমি কোথায় ছিলাম?"

নীরবতা। লম্বা নীরবতা।

"মা?"

"তুই... তুই কেন জিজ্ঞেস করছিস?"

"কারণ আমার মনে নেই।"

আবার নীরবতা। "নোভা, তুই কি ওষুধ খাচ্ছিস?"

"মা, ওষুধের কথা বলো না। আমাকে বলো।"

মায়ের কণ্ঠ কেঁপে উঠল। "তুই একটা অ্যাক্সিডেন্টে পড়েছিলি। ঢাকায়। তারপর... তারপর অনেকদিন হাসপাতালে ছিলি।"

"কোন হাসপাতাল?"

"বারডেম।"

"বারডেম?"

"হ্যাঁ। কিন্তু তুই কেন এই কথা জিজ্ঞেস করছিস? তোর কি মাথা ব্যথা করছে? ঘুম হচ্ছে না?"

"মা।" নোভার গলা শক্ত হলো। "আমি ঠিক আছি। শুধু একটু জানতে চাইছিলাম।"

"নোভা..."

"রাখছি মা।"

সে ফোন রেখে দিল। বারডেম। কিন্তু এনআইডিতে লেখা ঢাকা মেডিকেল। দুটো আলাদা হাসপাতাল। কোনটা সত্যি?

#পর্বঃ ৮

পরের সপ্তাহ। নোভা পরিকল্পনা করল। সে এবার সরাসরি যাবে না। সতর্কভাবে যাবে। সে উত্তরার সেই বিল্ডিং থেকে তিন রাস্তা দূরে একটা চায়ের দোকানে প্রতিদিন বসতে শুরু করল। পর্যবেক্ষণ। কে আসে? কে যায়?

তৃতীয় দিন সে দেখল একজন মহিলা বিল্ডিং থেকে বের হচ্ছে। সাদা অ্যাপ্রন। কাঁধে ব্যাগ। চিকিৎসক। নোভা উঠে তাকে ফলো করল। মহিলা একটা ফার্মেসিতে ঢুকল। নোভাও ঢুকল। মহিলা ওষুধ কিনছে। নোভা পাশে দাঁড়াল। ওষুধের নাম দেখল। মেমোরেক্স-৯। নোভা কখনো এই নামের ওষুধ শোনেনি।

সে ফার্মাসিস্টকে জিজ্ঞেস করল, "এই ওষুধটা কীসের জন্য?"

ফার্মাসিস্ট একটু থামল। "এটা প্রেসক্রিপশন ড্রাগ।"

"আমি জানি। কীসের জন্য?"

"স্মৃতি... স্মৃতি রিকনস্ট্রাকশনের জন্য।"

নোভার পাশ থেকে মহিলা চলে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগে একটু পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখে নোভাকে চেনার একটা ছায়া।

সেই রাতে নোভা সিদ্ধান্ত নিল। কাল সে ভেতরে যাবে। যেভাবেই হোক। সে পরিকল্পনা করল। বিল্ডিংয়ের পেছনের দরজা। তালা আছে কিন্তু ডিজিটাল লক। চার সংখ্যার পাসওয়ার্ড। সে চিন্তা করল। কোনো সংখ্যা বিশেষ মনে আসছে? তার মাথায় একটা সংখ্যা ঘুরছে অনেকদিন ধরেই। ১১৯৯। কেন এই সংখ্যা? সে জানে না। কিন্তু এটা মাথায় ঘুরতেই থাকে।

পরদিন রাতে। নোভা বিল্ডিংয়ের পেছনে গেল। ক্যামেরাটা আছে। সে একটা কাপড় দিয়ে ক্যামেরার লেন্স ঢেকে দিল। লকের কাছে গেল। ১১৯৯। বিপ। দরজা খুলে গেল। নোভার পা কাঁপছে। কিন্তু সে ঢুকল। ভেতরে একটা সিঁড়ি। সে তৃতীয় তলায় গেল। ভেতরে অন্ধকার। সে ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বাললো। একটা লম্বা করিডোর। দুপাশে দরজা। একটা দরজায় লেখা: "Subject Archive।" নোভা দরজা ঠেলল। খোলা। ভেতরে ফাইলের তাক। অনেক। সারি সারি। প্রতিটা ফাইলে একটা নাম। সে হাঁটতে হাঁটতে ফাইল দেখল। তারপর থামল।

একটা ফাইলে তার নাম। "NOVA ISLAM — Subject ID: NI-2247"

সে ফাইলটা টেনে নামাল। খুলল। প্রথম পাতায় একটা ছবি। তার ছবি। কিন্তু চোখ বন্ধ। মাথায় ইলেক্ট্রোড লাগানো। হাতে ক্যানুলা। পেছনে লেখা: "Memory Reset Protocol — Day 1।" নোভার হাত কাঁপছে।

সে পাতা উল্টাল। তারিখ। চার বছর আগের। চার বছর। মায়ের বলা অ্যাক্সিডেন্টের সময়। সে পড়তে লাগল।

রিপোর্টে লেখা: "Subject NI-2247 (নোভা ইসলাম, F, 23 years) was inducted into Phase 3 of Project ARCUS on 14 February, 2022. Baseline memory architecture was mapped and stored. Following consent protocol M-7, daily memory manipulation began on 16 February. Goal: To test the resilience and adaptability of human memory under controlled environmental changes. The subject's waking reality will be systematically altered to study cognitive adaptation, identity stability, and resistance threshold. The subject has consistently shown higher-than-average resistance. Previous subjects (n=47) failed to detect inconsistencies beyond Day 12. Subject NI-2247 has reached Day 30 without protocol breakdown. Recommendation: Continue observation. Increase stimuli."

কনসেন্ট প্রোটোকল এম-৭। কনসেন্ট। মানে সম্মতি। মানে নোভা নিজে সম্মতি দিয়েছিল? সে আরো পাতা উল্টাল। একটা পাতায় একটা সই। তার নিজের সই। তারিখ: ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২। নোভা স্বেচ্ছায় এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল? কিন্তু কেন?

সে পেছনে তাকাল। এবং দেখল করিডোরে আলো জ্বলে উঠেছে। কেউ আসছে।

#পর্বঃ ৯

নোভা ফাইলটা বুকে চেপে ধরল।

আলো আসছে করিডোরের শেষ থেকে। ধীরে। পায়ের শব্দ একটা না, দুটো। নোভা ঘুরে তাকাল। পালানোর পথ? আর্কাইভ রুমের পেছনে আরেকটা দরজা। সে দৌড়াল। দরজার হ্যান্ডেল ধরল। টানল। বন্ধ।

ঠিক তখন।

"নোভা।"

কণ্ঠস্বর চেনা। সে থামল। ঘুরল।

করিডোরের আলোর মধ্যে দুজন মানুষ। একজন মহিলা, সাদা অ্যাপ্রন। সেই মহিলা যাকে সে ফার্মেসিতে দেখেছিল। আরেকজন পুরুষ, লম্বা, চশমা পরা, চুলে পাক ধরেছে। নোভা তাকে চেনে না।

কিন্তু লোকটা নোভাকে চেনে। নিশ্চিতভাবে। কারণ সে দাঁড়িয়ে আছে, হাত পকেটে, মুখে এমন একটা ভাব যেন একটা দীর্ঘ অপেক্ষার পর কেউ পরিচিত মানুষকে দেখল।

"ভালোই করেছ এসেছ," লোকটা বলল। "আমরাই ডাকতে আসছিলাম।"

"কে আপনি?" নোভার কণ্ঠ শক্ত।

ডাক্তার ফারহান এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

"সেটাই তোমাকে বোঝাতে চাই।"

"বোঝানোর দরকার নেই। পড়েছি। আমি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিষয়। চার বছর ধরে আমার স্মৃতি বদলে দিচ্ছেন। রিয়েলিটি বদলে দিচ্ছেন।"

"হ্যাঁ।" ডাক্তার ফারহান সরাসরি বললেন। কোনো ভণিতা ছাড়া।

নোভা প্রস্তুত ছিল একটা অস্বীকার বা ব্যাখ্যার জন্য। এই সরাসরি স্বীকৃতিতে একটু ধাক্কা খেল।

"কেন?"

"এসো। বসে কথা বলি।"

"এখানেই বলুন।"

ডাক্তার ফারহান তার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, "তুমি কি জানতে চাও কেন তুমি সম্মতি দিয়েছিলে?"

নোভার হাতের আঙুলগুলো ফাইলের কোণায় আরো শক্ত হলো।

"হ্যাঁ।"

"তাহলে এসো।"

রুমটা ছোট। একটা টেবিল, চারটা চেয়ার, একটা স্ক্রিন। দেয়ালে কোনো জানালা নেই। ডাক্তার ফারহান বসলেন। মহিলা ডাক্তার, যার নাম পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো ডাক্তার সাবিরা, পাশে বসলেন। নোভা বসল না।

"বলুন।"

ডাক্তার ফারহান টেবিলের ওপর হাত রাখলেন। "নোভা, তুমি ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ তারিখে এই প্রজেক্টে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছিলে। কনসেন্ট ফর্ম সই করার আগে তোমাকে পুরো প্রক্রিয়া বোঝানো হয়েছিল। তুমি জানতে, কী হবে।"

"আমার মনে নেই।"

"মনে থাকার কথা না। কারণ মেমোরি রিসেট প্রোটোকলের প্রথম ধাপেই তোমার সেই দিনের স্মৃতি মুছে দেওয়া হয়েছে।"

নোভা অবশেষে বসল। "কেন আমি রাজি হয়েছিলাম?"

ডাক্তার ফারহান ডাক্তার সাবিরার দিকে তাকালেন। সাবিরা উঠে স্ক্রিন অন করলেন।

স্ক্রিনে একটা ভিডিও চলতে লাগল।

নোভা স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

এবং নিজেকে দেখল।

ভিডিওতে একটা হাসপাতালের ঘর। সাদা দেয়াল। সাদা বিছানা। বিছানায় একটা মেয়ে শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ। মাথায় ব্যান্ডেজ। হাতে ক্যানোলা। এই মেয়েটা নোভা।

কিন্তু এই নোভা অনেক বেশি ফ্যাকাশে। অনেক বেশি নিস্তেজ।

পাশে বসে আছেন একজন মহিলা। বয়স্ক। চোখে পানি। নোভার মা।

ভিডিওর পাশে একটা তারিখ: ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২।

তারপর কাট। নতুন ভিডিও।

এখন নোভা জেগে আছে। বিছানায় উঠে বসেছে। সামনে ডাক্তার ফারহান, কিন্তু তরুণ, চুলে পাক নেই। আর একটা স্ক্রিন, যেখানে দেখাচ্ছে মস্তিষ্কের স্ক্যান।

ডাক্তার ফারহান বলছেন, "তোমার হিপোক্যাম্পাসে একটা ক্ষতি হয়েছে, নোভা। অ্যাক্সিডেন্টের কারণে। এই ক্ষতি বাড়তে থাকবে। দুই বছরের মধ্যে তুমি সব স্মৃতি হারাবে। স্থায়ীভাবে।"

ভিডিওর নোভা চুপ। একটু পর জিজ্ঞেস করে, "সমাধান?"

"আমাদের একটা পদ্ধতি আছে। নিউরাল মেমোরি ম্যানিপুলেশন। আমরা তোমার মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষণ দিতে পারি, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে। প্রতিদিন একটু একটু চ্যালেঞ্জ দিলে মস্তিষ্ক নতুন নিউরাল পাথওয়ে তৈরি করবে। ক্ষতিগ্রস্ত হিপোক্যাম্পাসকে বাইপাস করে।"

"মানে?"

"মানে তুমি স্মৃতি হারাবে না। কিন্তু প্রক্রিয়াটা কঠিন। প্রতিদিন তোমার চারপাশ বদলে দেওয়া হবে। ভুয়া স্মৃতি তৈরি করা হবে। তোমার মস্তিষ্কের প্রতিটা কোণ পরীক্ষা করা হবে।"

"কতদিন?"

"অন্তত তিন মাস।"

ভিডিওর নোভা জানালার দিকে তাকাল। বাইরে ঢাকা শহর।

"আমার যদি মনে না থাকে যে আমি এই পরীক্ষায় আছি?"

"সেটাই পয়েন্ট। মনে থাকলে ব্রেন প্রিপেয়ার্ড থাকবে। চ্যালেঞ্জটা কাজ করবে না।"

ভিডিওর নোভা দীর্ঘ সময় চুপ করে রইল। তারপর বলল, "ঠিক আছে।"

ভিডিও শেষ।

নোভা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

বুকের ভেতরে কী হচ্ছে, সেটার নাম সে জানে না। রাগ, কষ্ট, অবাক, ভয়, তিনটে মিলিয়ে একটা জিনিস যার বাংলায় কোনো শব্দ নেই।

"তাহলে," সে ধীরে বলল, "আমি নিজেই এটা চেয়েছিলাম।"

"হ্যাঁ।"

"কিন্তু রিসেট কেন? কনসেন্টটা কেন মুছে দিলেন?"

ডাক্তার ফারহান একটু এগিয়ে বসলেন। "কারণ মানুষ স্বেচ্ছায় কঠিন কিছুতে রাজি হলেও, যখন সেটা শুরু হয়, তখন ছেড়ে দিতে চায়। তুমি জানলে যে এটা পরীক্ষা, মস্তিষ্ক রেজিস্ট্যান্স তৈরি করত। থেরাপি কাজ করত না।"

নোভার চোয়াল শক্ত হলো।

"তাহলে লিলি? আরিবা? মা? তারাও সব জানত?"

একটু থামলেন ডাক্তার। "লিলি আর আরিবা জানে। তারা প্রোটোকলের অংশ। প্রতিদিন তোমার রিয়েকশন মনিটর করে আমাদের রিপোর্ট দেয়।"

নোভার মাথার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে পড়ল।

তার ছোটবেলার বন্ধু। তার সহকর্মী। চার বছর ধরে। রিপোর্ট করছে।

সে উঠে দাঁড়াল। ডাক্তার ফারহান কিছু বলার আগেই সে জিজ্ঞেস করল, "মা?"

"তোমার মা জানেন না।"

নোভা চোখ বন্ধ করল। একটু।

"তাহলে মা কেন বারডেমের কথা বললেন? আপনারা তো বললেন ঢাকা মেডিকেল?"

ডাক্তার সাবিরা প্রথমবার কথা বললেন, নরম কণ্ঠে। "কারণ তোমার মাকে বলা হয়েছিল তুমি বারডেমে ছিলে। আসলে তুমি এখানে ছিলে। তোমার মাকে সত্যটা বলা হয়নি। প্রটেকশনের জন্য।"

"কার প্রটেকশন?"

নীরবতা।

"কার প্রটেকশন?" নোভার কণ্ঠ এবার উঁচু।

ডাক্তার ফারহান বললেন, "তোমার।"

নোভা একটু হাসল। তিক্ত হাসি। "আমার প্রটেকশনের জন্য আমার মাকে মিথ্যা বললেন।"

"নোভা, থেরাপিটা কাজ করেছে।" ডাক্তার ফারহান সরাসরি বললেন। "তোমার হিপোক্যাম্পাসের ক্ষতি এখন ৮৩% মেরামত হয়েছে। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ। তারপর তুমি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।"

নোভা থেমে গেল।

৮৩ শতাংশ।

মানে সে ভালো হচ্ছিল। এই পুরো দুঃস্বপ্নের মধ্যে, প্রতিদিনের ভয়ের মধ্যে, সে আসলে সুস্থ হচ্ছিল।

"তাহলে," নোভা বসল। এবার সত্যিকারের ক্লান্তিতে। "নাইটির পকেটে যে চিঠি পেয়েছিলাম? 'তুমি যতটা ভাবো ততটা নিরাপদ না'?"

ডাক্তার ফারহান ডাক্তার সাবিরার দিকে তাকালেন।

ডাক্তার সাবিরার মুখের রঙ একটু বদলাল।

"সেটা আমরা লিখিনি।"

নোভা সোজা হয়ে বসল। "কী?"

"সেটা আমাদের প্রোটোকলের অংশ ছিল না।"

নোভার বুকের ভেতরে ঠান্ডা একটা ঢেউ নামল। "ডায়েরিতে লাল কালির বৃত্ত? সেটাও না?"

"না।"

ঘরে নীরবতা।

ডাক্তার ফারহান সামনে ঝুঁকলেন। তার মুখে এখন আর বিজ্ঞানীর নিরুত্তাপ ভাব নেই। কিছু একটা আছে। উদ্বেগ।

"নোভা, তুমি এখানে আসার আগে কেউ তোমাকে ফলো করেছিল কি?"

নোভার মনে পড়ল সেই লোকটার কথা। গলির মুখে। ফোন কানে।

"হ্যাঁ।"

"কোথায়?"

"উত্তরায়। এই বিল্ডিং থেকে বের হওয়ার পর।"

ডাক্তার ফারহান ডাক্তার সাবিরার দিকে তাকালেন। একটা নিঃশব্দ বার্তা পাস হলো দুজনের মধ্যে।

"নোভা," ডাক্তার ফারহান বললেন, "আমাদের প্রজেক্টে মোট ৪৮ জন সাবজেক্ট আছে। তুমি সহ। বাকি ৪৭ জনের মধ্যে গত তিন সপ্তাহে ৬ জন... নিখোঁজ হয়েছে।"

সময় যেন থমকে গেল।

"নিখোঁজ?"

"আমরা জানি না কে এটা করছে। আমরা জানি না কেন। কিন্তু আমরা জানি, তারা এই প্রজেক্টের সাবজেক্টদের টার্গেট করছে।"

"কারা তারা?"

ডাক্তার ফারহান উঠে দাঁড়ালেন। "সেটাই সমস্যা।" তিনি জানালাবিহীন দেয়ালের দিকে তাকালেন। "আমরা জানি না। কিন্তু তোমার ডায়েরিতে যে চিঠিটা পেয়েছ, সেটা একই হাতের লেখা, যে লেখা আমরা আগের একটা নিখোঁজ সাবজেক্টের ঘরে পেয়েছিলাম।"

"কার ঘরে?"

ডাক্তার ফারহান একটু থামলেন।

"সাবজেক্ট NI-2246।"

নোভার শ্বাস আটকে গেল।

"আমি ২২৪৭। ও ছিল ২২৪৬।"

"হ্যাঁ।"

"মানে আমার আগের সাবজেক্ট।"

"হ্যাঁ।"

"সে কোথায় এখন?"

ডাক্তার ফারহান নোভার দিকে সরাসরি তাকালেন। "আমরা জানি না।"

নোভা উঠে দাঁড়াল। হাতের ফাইলটা টেবিলে রাখল।

চোখের ভেতরে ভয় নেই। ক্লান্তি নেই। একটা অদ্ভুত স্থিরতা এসে গেছে।

কারণ সব হিসাব মিলে গেছে।

সে মানসিক রোগী না। সে পাগল না। সে একটা পরীক্ষার বিষয়, এটা সত্যি, কিন্তু সেই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তার নিজের সিদ্ধান্ত ছিল।

কিন্তু এর বাইরে আরেকটা গেম চলছে। অন্য কেউ। অন্য কারণে।

"আমার কতদিন বাকি?"

"থেরাপির? তিন সপ্তাহ।"

"ঠিক আছে।" নোভা দরজার দিকে হাঁটল। "তাহলে আমি থাকব।"

"কিন্তু..."

"কিন্তু," নোভা দরজায় দাঁড়িয়ে ঘুরল, "আমিও খুঁজব। ২২৪৬ কোথায়। কে এই চিঠি লিখেছে। এবং এই ছয়জন নিখোঁজ মানুষগুলো কোথায় গেছে।" সে একটু থামল। "আপনাদের সাহায্য লাগলে বলবেন।"

ডাক্তার ফারহান তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর হাসলেন। প্রথমবার।

"ফাইলে লেখা ছিল, 'higher than average resistance।' আমার মনে হয় সেটা ভুল ছিল।"

"কেন?"

"তোমার resistance শুধু average-র চেয়ে বেশি না। তুমি একমাত্র সাবজেক্ট যে নিজেই এসেছ। বাকি সবাই ভেঙে পড়েছে।"

নোভা কিছু বলল না। করিডোরে পা রাখল।

বাইরে রাত। ঢাকা শহরের আলো নিচে। নোভার মাথায় তিনটা প্রশ্ন ঘুরছে।

NI-2246 কোথায়?

যে চিঠি লিখেছে, সে কি শত্রু, না সে সাহায্য করতে চাইছে?

এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যেটার উত্তর ডাক্তার ফারহান দেননি।

অ্যাক্সিডেন্টটা আসলে কী ছিল?

হিপোক্যাম্পাস এমনি নষ্ট হয় না। কেউ একটা কারণ তৈরি করেছিল।

নোভা সিঁড়ির দিকে হাঁটল। পেছনে তৃতীয় তলার আলো নিভে গেল।

গাছটা আজ রাতেও আছে। বনানীর পার্কে। বড় কড়ই গাছ। স্থির।

I'd love to hear from you. Email me at: nasifwrites@gmail.com